হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মুহাম্মদী শাহরুদী তাঁর এক বক্তব্যে “বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?”—এই প্রশ্নের উত্তর দেন।
প্রশ্ন: বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
উত্তর: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ধর্মের দৃষ্টিতে এ ধরনের সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থানের পেছনে সুস্পষ্ট কিছু কারণ রয়েছে, যা বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিটি সমাজেই আইন মেনে চলা অপরিহার্য। একটি ইসলামী সমাজে আল্লাহর বিধানই সর্বোচ্চ আইন। ইসলামী শরিয়ত নির্দেশ দেয় যে, নারী ও পুরুষ যারা পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম, তাদের অবশ্যই নির্ধারিত সীমারেখা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় ও বৈধ ক্ষেত্র—যেমন কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা বা অনুরূপ জরুরি প্রয়োজন—ছাড়া তাদের সম্পর্ক শরিয়ত নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এসব সীমা অতিক্রম করা হারামের পর্যায়ে পড়ে এবং এ ধরনের সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে ব্যক্তি গুনাহের মধ্যে নিপতিত হয়।
দ্বিতীয়ত, এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত এমন এক সময়ে গড়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য এখনো সামনে আসে না। তখন উভয় পক্ষ একে অপরকে নিয়ে কল্পনার জগৎ নির্মাণ করে এবং অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে। যেহেতু তারা তখনো সংসারজীবনের বাস্তব দায়িত্বের মুখোমুখি হয়নি, তাই একে অপরের প্রতি তাদের চাওয়া-পাওয়া ও প্রত্যাশা ক্রমেই বেড়ে যায়।
পরবর্তীতে যখন তারা বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করে—হোক তা পরস্পরের সঙ্গে বা অন্য কারও সঙ্গে—তখন উপলব্ধি করে যে, তাদের কল্পিত ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে হতাশা ও অসন্তোষের জন্ম হয়। অনেক সময় উভয়েই একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করে। এখান থেকেই পারিবারিক অশান্তি, মতবিরোধ এবং দাম্পত্য সম্পর্কের দুর্বলতা শুরু হতে পারে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব আইন ও বিধিব্যবস্থা রয়েছে। ইসলামও ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য একটি সুস্পষ্ট জীবনব্যবস্থা প্রদান করেছে। একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও সভ্য সমাজ গড়ে তোলার জন্য এসব বিধান মেনে চলা অপরিহার্য। আইন উপেক্ষা করা হলে সমাজ তার শৃঙ্খলা ও স্বকীয়তা হারিয়ে বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হয়।
চতুর্থত, ইসলামের দৃষ্টিতে মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং জীবনের পরিপূর্ণতার সঙ্গে বিবাহের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিবাহ মানুষের আত্মিক, নৈতিক ও ব্যক্তিগত বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যে ব্যক্তি বিবাহ থেকে দূরে থাকে বা আল্লাহ নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে সম্পর্ক গড়ে তোলে, সে প্রকৃত পরিপক্বতা ও পরিপূর্ণতার পথে বাধার সম্মুখীন হতে পারে। কারণ মানুষের প্রকৃত কল্যাণ ও সফলতার পথ সেই পথই, যা আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন।
বিয়ের আগে প্রেম বা বন্ধুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শুধু শরিয়তের দৃষ্টিতে হারামই নয়, বরং এমন সম্পর্কের প্রতিটি অনৈতিক মুহূর্ত মানুষের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়। আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় বা আপস নেই; মানুষের সব কর্মই সংরক্ষিত হয়। এ ধরনের সীমালঙ্ঘন শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে এবং সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, যদি কোনো ছেলে ও মেয়ে সঠিক ও শরিয়তসম্মত পথে অগ্রসর হয়ে বৈধ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তাহলে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে বৈধ ও পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আল্লাহর বিধান অমান্য করে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী, এবং ইসলাম এ ধরনের সম্পর্ককে সমর্থন করে না।
আপনার কমেন্ট